যাকাত ইসলামি অর্থনীতির মেরুদণ্ড


যাকাত ইসলামি অর্থনীতির মেরুদণ্ড
যাকাত ইসলামি অর্থনীতির মেরুদণ্ড

যাকাত ইসলামি জীবন বিধানের অন্যতম

মৌল ভিত্তি ও অবশ্য পালনীয় একটি ফরয ইবাদাত। ইসলামের বুনিয়াদের মধ্যে  ইমান,নামাজ ও রোজা সকল মুসলমানের জন্য অবশ্য পালনীয়।  কিন্তু হজ ও যাকাত শুধু অর্থ সম্পদের দিক দিয়ে সামর্থ্যবান মুসলমানের উপর ফরজ। আর্থিক সামর্থ্য বলতে যাকাতযোগ্য সম্পদের মালিক হওয়াকে বুঝায়।


বস্তত যাকাত হচ্ছে সম্পদশালীদের সম্পদে আল্লাহর নির্ধারিত সেই ফরজ অংশ,যা যাকাতদাতার ধন-সম্পদকে পরিশুদ্ধ করে।এর প্রবৃদ্ধি সাধন করে।অন্য দিকে দরিদ্রদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ করে।

ইসলামি অর্থনীতি-ব্যবস্থার মেরুদণ্ড যাকাত। ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে  জনগনের মাঝে সম্পদের সুষম বন্টনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা। যাকাতব্যবস্থা ইসলাম পক্ষ থেকে মানুষের জন্য এক সুন্দরতম উপহার।

• যকাতের ফযিলত ও গুরুত্ব
যাকাত ও সাদাকা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম উপায়। কুরআন  মাজিদে ইরশাদ হয়েছে :خذ من اموالهم صدقة
   وتزكيهم بها

অর্থ : তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা (যাকাত) গ্রহণ  করুন।এর দ্বারা আপনি তাদের প্রবিত্র করবেন এবং পরিশোধিত করবেন।

উদাহরণ 

 একবার এক বেদুইন ব্যক্তি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে এসে বললেন, আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যা করলে আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব। নবীজি বললেন, তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কোনো কিছু শরিক করবে না, ফরজ নামাজ আদায় করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং রমযানে রোযা পালন করবে। বেদুইন বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ সেই সত্তার কসম, আমি এর থেকে কিছু বৃদ্ধি করব না, কমও করব না। এরপর লোকটি ফিরে যাওয়ার সময় নবীজি বললেন, কেউ যদি কোনো জান্নাতি ব্যক্তিকে দেখে আনন্দিত হতে চায়, তবে সে যেন এ ব্যক্তিকে দেখে নেয়। [সহিহ বুখারি: ১/১৮-৭/

কুরআনের দলীল

কুরআনুল কারিম ও হাদিস শরিফে স্পষ্ট ভাষায় যাকাতের বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। কুরআন মাজিদে ৩২ জায়গায় যাকাতের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ জায়গায় নামাজ ও যাকাতের কথা একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা যাকাতের নির্দেশ দিয়ে বলেন-


وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ.


অর্থ: তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত আদায় কর। তোমরা উত্তম কাজের যা কিছু পূর্বে প্রেরণ করবে আল্লাহর নিকট তা পাবে। তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তার দ্রষ্টা। [সুরা বাকারা: ১১০]


এজন্য, ইসলামে নামাজ ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করার কোনো অবকাশ নেই। নামায ও যাকাত দুটিই সমানভাবে মুসলমানদের জন্য ফরয করা হয়েছে।


 কার উপর যাকাত ফরজ


যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত: ১. মুসলমান হওয়া, স্বাধীন ও পূর্ণবয়স্ক হওয়া।


২. সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া। বর্ধনশীল হওয়া মানে যাকাতের সম্পদটি উৎপাদনক্ষম বা প্রবৃদ্ধমান হওয়া। এক্ষেত্রে সম্পদের বৃদ্ধি পাওয়ার যোগ্যতা থাকাই যথেষ্ট, বাস্তবে সেটা বৃদ্ধি পাওয়া জরুরি নয়।

৩. নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা। অর্থাৎ ব্যক্তির সর্বমোট আয় থেকে যাবতীয় ঋণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দেওয়ার পর তার নিকট সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা সাড়ে সাত তোলা সোনা বা এই পরিমাণ সোনা বা রুপার মূল্য থাকলে তাকে সম্পদের যাকাত দিতে হবে। মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে গরিবদের জন্য অধিক লাভজনক দিকটি লক্ষ রাখতে হবে।


৪. ঋণ মুক্ত হওয়া। অর্থাৎ ঋণ বাদ দিয়ে যদি উল্লিখিত পরিমাণ সম্পদ উদ্বৃত্ত হয়, তখনই কেবল যাকাত দিতে হবে।


৫. সম্পদের মালিকানা এক বছর থাকা। অর্থাৎ কারো কাছে কমপক্ষে নিসাব পরিমাণ সম্পদের পুরো এক বছর অতিবাহিত হওয়া। অবশ্য মাঝে একটু কম-বেশ হলে সেটা ধর্তব্য নয়।


নিম্নলিখিত সম্পদের উপর যাকাত ফরজ হয়: ১. সোনা-রুপা ও নগদ অর্থ। ২. ব্যবসায়িক পণ্য। ৩. কৃষিপণ্য। ৪. পশু সম্পদ। ৫. খনিজ সম্পদ।


নগদ ও ব্যবসায়িক অর্থের যাকাত


প্রচলিত মুদ্রা, টাকা, ডলার, পাউন্ড ইত্যাদির ক্ষেত্রেও চল্লিশ ভাগের একভাগ যাকাত প্রদান করতে হবে। এমনিভাবে ব্যাংকে রাখা নগদ অর্থ ছাড়াও, সঞ্চয়পত্র, সিকিউরিটি, শেয়ার সার্টিফিকেট, অন্যের কাছে পাওনা ঋণ ইত্যাদি নগদ অর্থ বলে গণ্য হবে। তবে যেসব ঋণ ফেরত পাওয়ার আশা নেই সেগুলো ধর্তব্য নয়। তবে সেগুলো যদি ভবিষ্যতে ফেরত পাওয়া যায়, তখন থেকে বছর পূর্ণ হলে যাকাত দিতে হবে। অন্যদিকে ব্যবসার জন্য গুদামে রক্ষিত মালামাল, কাঁচামাল, প্রক্রিয়াজাত মাল; সেইসঙ্গে ব্যবসার উদ্দেশ্যে কেনা জমি, মেশিন বা অন্যান্য সম্পদেরও যাকাত দিতে হবে।

প্রভিডেন্ট ফান্ড কি এবং কাকে বলে?

সরকারি চাকরিসহ অন্যান্য চাকরিজীবীদের মাসিক বেতনের একটি অংশ কেটে তার সঙ্গে চাকরিদাতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনুদানসহ বা অনুদান ছাড়া প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা করে। এটা সেই চাকরিজীবী ব্যক্তির সম্পদ বলে বিবেচিত। কিন্তু যাকাত দেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ মালিকানার শর্ত রয়েছে। অথচ
প্রভিডেন্ট ফান্ডের বেলায় সেটা নিশ্চিত নয় বলে চাকরি শেষে তা হস্তগত হওয়ার সর্তকতা অবলম্বননের জন্য প্রতিবছর এর ব্যালেন্স জেনে তার উপর যাকাত পূর্বে এ ফান্ডের উপর যাকাত দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কেউ যদি অতিরিক্ত দিয়ে দেয়, তিনি নিশ্চয়ই সেজন্য আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাবেন।


কোন কোন সম্পদের যাকাত দেওয়া ফরয নয়

নিম্নের সম্পদসমূহের উপর যাকাত নেই-

১. বসবাসের বাড়ি-ঘরের উপর যাকাত নেই। তা যত বড়, বিশাল ও মূল্যবান হোক না কেন।

২. দুর্লভ বস্তু যেমন মণিমুক্তা ইত্যাদির উপর যাকাত নেই।

৩. কৃষি কাজের জন্য যে পশু- যেমন গরু মহিষ উট প্রতিপালন করা হয়, তার উপর যাকাত নেই। এ ব্যাপারে মূলনীতি হলো, নিজের কারবারে উৎপাদনের জন্য যেসব উপাদান ব্যবহার করা হয় তা যাকাতের বাইরে থাকে। এজন্য যেসব পশু দিয়ে কৃষি কাজ করা হয় তার উপর যাকাত নেই। কারণ তার যাকাত জমিন থেকে উৎপন্ন ফসল থেকে আদায় করা হয়। এমনিভাবে উৎপাদনের যন্ত্রপাতির উপরও যাকাত নেই।


8. কল-কারখানা, মেশিন ও যন্ত্রপাতির উপর যাকাত নেই। এমনকি কারখানার দালান-কোঠা, ব্যবসায় ব্যবহৃত ফার্নিচার, দোকান-ঘর- এসবের উপর যাকাত নেই।

৫. ডেইরি ফার্মের পশুদের ক্ষেত্রে যাকাত নেই। কারণ সেগুলো উৎপাদনের উপাদানের মধ্যে পড়ে। অবশ্য ডেইরি ফার্ম থেকে উৎপাদিত পণ্যের মূল্যের উপর যাকাত দিতে হবে।

৬. মূল্যবান কোনো দুষ্প্রাপ্য জিনিস কেউ যদি শখ করে ঘরে রাখে, তার ওপর যাকাত নেই। তবে যদি এর ব্যবসা করা হয় তাহলে যাকাত দিতে হবে।

৭. কেউ যদি চৌবাচ্চায় বা পুকুরে সৌখিন মাছ পোষে অথবা শখ করে কোনো পশু বা পাখি পোষে তাহলে তার উপর যাকাত নেই। কিন্তু এর ব্যবসা করলে যাকাত দিতে হবে।জন্য গাভী, বোঝা বহনের জন্য গরু-মহিষ, যানবাহনের জন্য সোড়া, হাতি, গৃহপালিত পদ্ম যদি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে রাখা হয়, যেমন দুখ পারদের উট- তাহলে তার সংখ্যা যতই হোক যাকাত দিতে হবে না।

৯. ওপরে যাকাত নেই। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য মোটর সাইকেল, কার, বাস থাকলে তার

১০. ডিম বিক্রির জন্য হাঁস-মুরগির ফার্ম করলে হাঁস-মুরগির উপর যাকাত নেই। তবে বিক্রীত হাঁস-মুরগি ও ডিমের মূল্যের উপর যাকাত ফরজ হবে।

১১. যেসব জিনিস ভাড়ায় খাটানো হয়, সাইকেল, রিকশা, ট্যাক্সি, বাস, ট্রাক, ফার্নিচার, ক্রোকারিজ ইত্যাদি অথবা যেসব দোকান ও বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়, তার ওপর যাকাত নেই। তবে এসব থেকে যে আয় হবে তা যদি নিসাস পরিমাণ হয়, তাহলে তা থেকে যাকাত দিতে হবে। কিন্তু এসব মূল জিনিসের মূল্যের উপর যাকাত নেই।


১২. ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র এবং অফিসের যাবতীয় আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি, ফোন, ফ্যাক্স, কম্পিউটার ইত্যাদির উপর যাকাত নেই।

১৩. গাধা খচ্চর ও ঘোড়ার উপর যাকাত নেই, যদি তা ব্যবসার জন্য না হয়।

১৪. ওয়াকফের পশুর উপর যাকাত নেই। এছাড়া যেসব ঘোড়া জিহাদের জন্য পালা হয় এবং যেসব হাতিয়ার দীনের খেদমতের জন্য প্রস্তুত করা হয়, তার উপরও যাকাত নেই।

১৫. দাতব্য বা সমাজ-কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ- যা জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত তার উপর যাকাত নেই।

১৬.

সরকারি মালিকানাভুক্ত নগদ অর্থ, সোনা-রুপা এবং অন্যান্য সম্পদের উপর যাকাত নেই।



Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url